ভাড়া দিতে না পেরে বাসা ছেড়ে স্কুলেই উঠেছেন, বিক্রি করছেন ফল

0 ৭০

আলোকিত লংগদু ডেক্সঃ

আদাবর বাজারের কাছে বাসাটি। গাড়িবারান্দায় ছোট্ট দোলনা, রঙিন মই। নিচতলায় পাশাপাশি কয়েকটি ঘরের বন্ধ দরজার ওপর শ্রেণির নাম লেখা। দেয়ালে ফুল-লতা-পাতা আঁকা। এসব আয়োজন নিয়ে করোনাকালে সুনসান পড়ে আছে ছোট্ট কিন্ডারগার্টেন পপুলার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।

একটি ঘরের দরজা একটু ফাঁক করা, ভেতরটা অন্ধকার। মুঠোফোনে কল দিলে পাশের ক্লাসঘর থেকে বেরিয়ে এলেন প্রধান শিক্ষক আমিনা বেগম। আপাতত স্কুলের দুটি ঘরে তাঁর এলোমেলো সংসার।

নিজেই অফিস ঘর খুলে এই প্রতিবেদককে বসতে দিলেন আমিনা। বললেন, প্রায় চার মাস হলো স্কুল বন্ধ, ছেলেমেয়েদের বেতন আদায়ও বন্ধ। দোতলায় থাকতেন, খরচ কমানোর জন্য বাসা ছেড়ে দিয়ে স্বামী আর দুই মেয়েসহ স্কুলে উঠেছেন।

গত মার্চ থেকে স্কুলের ভাড়াও বাকি পড়েছে। দুজন কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে আমিনা এখন রাস্তার ধারে শামিয়ানা খাটিয়ে টেবিল পেতে ফল বিক্রি করছেন। কাছেই সম্পা মার্কেটের কাছে অস্থায়ী এই দোকানের ব্যানারে লেখা, ‘১০০% ফরমালিনমুক্ত রাজশাহীর বিখ্যাত আম ও লিচুর মেলা’।

সেদিন ৪ জুলাই সকালে দোকান দেখাতে নিয়ে গিয়ে আমিনা বলেছিলেন, ‘আম তো কিছুদিন পর শেষ হয়ে যাবে। তখন কী করব? কারও কাছে হাতও পাততে পারব না।’

আমিনার স্কুলটি নিম্নবিত্ত এলাকায়। শিক্ষার্থীদের বেতন কম। কিন্তু এখন সেটুকুও অভিভাবকেরা দিতে পারছেন না। উজান আহমেদ এই স্কুলের ২৩৫ জন শিক্ষার্থীর একজন। তার গাড়িচালক বাবার বেতন করোনাকালে অর্ধেক হয়ে গেছে।

স্কুলে শিক্ষক আছেন ১২ জন। তাঁরা বেতনের সঙ্গে টিউশনির আয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলতেন। এখন সবই বন্ধ। অনেকে ঢাকা ছেড়েছেন। আবদুল্লাহ আল মামুন যেমন কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে ফিরে টুকটাক চাষবাস করে চলতে চেষ্টা করছেন। মুঠোফোনে তিনি বললেন, সুদিনের আশা মিলিয়ে যাচ্ছে।

এলাকা ঘুরে করোনাদুর্গত বেশ কয়েকটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল দেখা গেল। আরেকটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকও পরিবার নিয়ে স্কুলের দুটি ঘরে উঠেছেন। একটি স্কুল বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছে, দরদাম চলছে।

দেশজুড়ে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠা এসব ছোটখাটো কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রায় সবই ভাড়াবাড়িতে চলে। আমিনার মতো অনেক উদ্যোক্তা নিজেরাই প্রধান শিক্ষক। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসহ সব খরচ ওঠে শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনা ছুটি শুরু হয়েছে গত ১৭ মার্চ থেকে। সেই ইস্তক শিক্ষার্থীদের বেতনপত্র আদায় বন্ধ। উদ্যোক্তারা বলছেন, স্কুল খুললেও অনেক ছেলেমেয়ে হয়তো ফিরবে না। বাড়িওয়ালারা ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। অনেক উদ্যোক্তা গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন বা যাচ্ছেন। শিক্ষকেরাও চলে যাচ্ছেন, পেশা বদলাচ্ছেন।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেছেন, হবিগঞ্জের একজন শিক্ষক চা-কফি বিক্রি করছেন। দিনাজপুরের একজন শিক্ষক রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করছেন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের একজন শিক্ষক নৌকা চালাচ্ছেন।

বাংলা ও ইংরেজি দুই মাধ্যমেই কিন্ডারগার্টেন হচ্ছে শিশুদের হাতেখড়ির বিদ্যায়তন। তবে স্কুলগুলো সচরাচর পঞ্চম শ্রেণি পার করিয়ে দেয়। গত বছর আমিনার স্কুল থেকে ৩১ জন প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে। কিছু স্কুল আবার দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে অন্য স্কুলের নামে মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা দেওয়ায়।

দেশে এমন স্কুলের সংখ্যা কত, সরকারের কাছে তার হিসাব নেই। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) হিসাবে সরকারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও এনজিওর স্কুলসহ প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা সোয়া লাখের কিছু বেশি। সব মিলিয়ে পড়ে প্রায় পৌনে দুই কোটি ছেলেমেয়ে।

কিন্ডারগার্টেনগুলোর দু-তিনটি সমিতি আছে। সেগুলোর হিসাবে, দেশে এমন স্কুলের সংখ্যা ৪০ হাজারের কিছু বেশি। একেক স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০০ থেকে ৪০০ পর্যন্ত হতে পারে। মোট শিক্ষার্থী ৫০ লাখের বেশি। আর শিক্ষক আছেন প্রায় ৬ লাখ।

সারা দেশে ৪০ হাজারের বেশি স্কুল
শিক্ষার্থী ৫০ লাখের বেশি
উদ্যোক্তা ও শিক্ষকদের টিকে থাকা দুঃসাধ্য

ইকবাল বাহার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কাল আরও বাড়লে অর্ধেকের বেশি কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। তাঁরা তাই টিকে থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যেকোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা চান।

সংকট গভীর
আমিনা বেগম পঞ্চগড়ের মানুষ। স্নাতকোত্তর পাস করেছেন রাজশাহীর একটি প্রতিষ্ঠান থেকে। বিয়ের এক বছর পর ২০০৬ সালে ঢাকায় আসেন। স্বামী সাভারের ইপিজেডে চাকরি করেন। দুই মেয়ে স্কুলে পড়ে। নিজে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি করতেন, ২০১৬ সালে আদাবরে একটি বাসাবাড়ির নিচতলায় আটটি ঘর ভাড়া নিয়ে পপুলার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

বন্ধ স্কুলের অফিসঘরে করোনা-দূরত্ব রেখে বসে তাঁর সঙ্গে অনেক কথাই হয়েছিল। বলেছিলেন, তাঁর স্কুলে শ্রেণিভেদে শিক্ষার্থীদের বেতন ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা। অভিভাবকদের অল্প আয়, অনেক সময় কমবেশি ছাড় দিতে হয়।

শিক্ষকদের বেতন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে। শিক্ষকেরা মূলত টিউশনি ও কোচিং করিয়ে চলতেন। তিনি প্রধান শিক্ষক, তাঁকেও তা-ই করতে হতো। আমিনা বলেন, সব কিন্ডারগার্টেন শিক্ষককে এভাবেই চলতে হয়। গত মার্চ থেকে তাঁদের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।

মোহাম্মদপুরে নবীনগর হাউজিং এলাকার এই কিন্ডারগার্টেন স্কুল বিক্রির জন্য স্কুলের সামনে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ছবি: প্রথম আলোআমিনা থাকতেন স্কুলের দোতলায়। বাসা ও স্কুল মিলিয়ে মাসে ভাড়া দিতেন ৪৫ হাজার টাকা। গত এপ্রিলে বাসা ছেড়ে স্কুলের দুটি ঘরে ঠাঁই নিয়েছেন। ভাড়ায় ১২ হাজার টাকা বেঁচেছে। কিন্তু মার্চের পর থেকে স্কুলের ভাড়া দিতে পারছেন না।

নিরুপায় হয়ে জুন থেকে স্কুলের দুজন কর্মীসহ কয়েকজন মিলে রাজশাহী থেকে আম আনাচ্ছেন। নিজেও রাস্তার পাশের অস্থায়ী দোকানে বসছেন। এক মাসে ১৪-১৫ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। কর্মীদের ভাগ দিয়েথুয়ে হাতে বিশেষ টেকেনি।

শিক্ষকদের বেতন বা বাড়িভাড়া, কিছু্রই সুরাহা হয়নি। অন্যদিকে নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস নেওয়া কঠিন। পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। আমিনা বলেন, দেখে মনে হচ্ছে বছরটা এমনই যাবে। টিকে থাকা কঠিন হবে।

আবদুল্লাহ আল মামুন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশলবিদ্যা পড়ার পাশাপাশি এই স্কুলে পড়াতেন। বেতন পেতেন প্রায় ৪ হাজার টাকা। টিউশনি থেকে বেশ কিছু টাকা আসত। স্ত্রী ও এক শিশুসন্তান নিয়ে একটি ঘর ভাড়া করে ‘কোনোমতে’ চলে যাচ্ছিল।

এখন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন। সেখানে এক টুকরো জমি ইজারা নিয়ে মরিচ বুনেছেন। ফেরার আশায় ঢাকার ঘরটা ছাড়েননি। সঞ্চয় ভেঙে ভাড়া জুগিয়ে যাচ্ছেন। ২০ হাজার টাকা ঋণ করেছেন।

মুদিদোকান আর স্কুল বিক্রি
আদাবরে বায়তুল আমান সোসাইটির ১৭ নম্বর রাস্তায় ঝাঁপবন্ধ দোকানপাটের ফাঁকে অ-আ-ক-খ লেখা ছোট্ট একটি ফটক। আঞ্জুমান রেসি. মডেল স্কুলের সামনেই অপেক্ষা করছিলেন প্রধান শিক্ষক নিজামউদ্দিন। নামে রেসিডেনসিয়াল, আদতে অনাবাসিক। তিনতলা বাসার পুরোটা নিয়ে স্কুল।

নিজামউদ্দিন নিয়ে বসালেন দোতলার একটি ক্লাসঘরে, যেটা এখন তাঁর শোয়ার ঘর। গত মাসে সপরিবার এখানে উঠেছেন। বেঞ্চ-টেবিলগুলো অন্য ক্লাসে স্তূপ করে রেখেছেন। বাসাভাড়ার সাড়ে ১৩ হাজার টাকা খরচ কমেছে, স্কুল ভাড়ার ৩৫ হাজার টাকা দিতে পারছেন না।

মধ্যবয়সী মানুষটি বলেন, অনেক দিন বেকার ছিলেন। বাড়ি থেকে নানাভাবে টাকা জোগাড় করে ২০০৩ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্লে গ্রুপ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী প্রায় ৩০০। শিক্ষক ১৩ জন। গত মার্চ থেকে শিক্ষার্থীদের বেতন বকেয়া। তিনিও শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছেন না।

ওদিকে মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিং সোসাইটি এলাকায় ফুলকুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড হাইস্কুলের সামনে নোটিশ ঝুলছে, ফার্নিচারসহ স্কুল বিক্রি হবে। ভেতরে বসে ছিলেন চেয়ারম্যান তকিবর হোসেন। বললেন, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করে বহু কষ্টে স্কুলটি দাঁড় করিয়েছিলেন।

একতলা বাড়ির ১০টি ঘর নিয়ে স্কুল, শিক্ষার্থী ২৫০ জন। ১২ জন শিক্ষক, ছয় থেকে সাত হাজার টাকা করে বেতন। সব মিলিয়ে মাসে খরচ লাখ টাকা। গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে শিক্ষার্থীরা বেতন দিচ্ছে না। তকিবর বললেন, মালিকানা যাক, তবু স্কুলটা থাক।

পপুলার স্কুলের উদ্যোক্তা ও প্রধান শিক্ষক আমিনা বেগম সরকারের মুখের দিকে চেয়ে আছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, সংকটের কথা তাঁরাও বোঝেন। কিন্ডারগার্টেনগুলো মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করলে আলোচনা হতে পারে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী অবশ্য বললেন, স্কুলগুলো বাঁচানোর মূল দায়দায়িত্ব উদ্যোক্তাদেরই। তাঁরা মূলত ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিতে স্কুল চালিয়েছেন। বিধিমালার আওতায় নিবন্ধিত থাকলে সরকারের কাছে তাঁদের জন্য জোর গলায় দেনদরবার করা যেত। তবে সরকার তাঁদের বিনা সুদে ঋণ দিতে পারে।

আপনার ইমেইল প্রদর্শন করা হবে না।