রোহিঙ্গারা খাদ্যেকষ্টে আছে,নিজভুমে ফিরতে ইচ্ছুক

0 ৪৪

শ.ম.গফুর,উখিয়া(কক্সবাজার)থেকে

২৫ আগষ্ট (আজ) রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ৩ বছর পূর্ণ হয়েছে।এ বছর দিনটি ক্যাম্পে পালিত হচ্ছেনা।রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় বস্তুিতে অবস্থান করে জিকির প্রার্থনা করার কথা জানা গেছে।এর বাইরে কিন্তু মাস্ক প্রদর্শন করে কুতুপালং ক্যাম্পে অভিনব প্রতিবাদ লক্ষ্য করা গেছে।

গত তিন বছর ধরে উখিয়ার অস্থায়ী ক্যাম্পে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে বসবাস করছে রোহিঙ্গা বয়োবৃদ্ধ খলিলুর রহমান।তিনি সাত নং ক্যাম্পের ডি-১ ব্লকের আশ্রিত রোহিঙ্গা। গিজগিজের বস্তিতে বৃদ্ধা স্ত্রী,৩ ছেলে ৪ কন্যা,২ পুত্রবধু নিয়ে বসবাস তাঁর।১২ হাত দৈর্ঘ,৮ হাত প্রস্থের বস্তিতে ঠাসাঠাসি অবস্থান।তাঁর মাঝে খাদ্য- সামগ্রীরও প্রবল সংকট।বিশ্ব খাদ্য সংস্থা( ডাব্লিউ এফপি) প্রদত্ত খাদ্য সামগ্রী জনপিঁছু মাসে প্রয়োজন অন্তত ২৫ কেজি।পাচ্ছি ১৩ কেজি করে।রোদ-বৃষ্টি মাথার উপর বয়ে যাচ্ছে।এমন পরিবেশে বসবাস আর কতদিন এমন প্রশ্ন জুড়ে দেন খলিলুর রহমান ছাড়াও শেডের ব্লক মাঝি নুরুল আলম,রোহিঙ্গা দিলু হোছন,আবদুল মজিদ, আবদুল মাজেদ।তাঁরা মিয়ানমারে ফিরতে ইচ্ছুক। কিন্তু প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে তাঁরা কিছুই অবগত নন। কোষ্ট ট্রাস্টের কক্সবাজারস্থ সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জানান,আমরা রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও কাজ করে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কুতুপালং ক্যাম্প- ১এর রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা আবদুর রহিম জানান,এভাবে কয় বছর থাকতে হবে?।নিজের দেশে তাঁর ছিল,জায়গা-জমি,গরু-ছাগল,
চাষাবাদ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রোহিঙ্গা বস্তিতে নিদারুন কষ্টে তিনটি বছর গত করে দিলাম।নিজের দেশে( মিয়ানমার) ফেরার ফলপ্রসু কোন উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছিনা।ক্যাম্প-৯ এর লালু মাঝি জানান,বর্ষার মৌসুমে পাহাড় ধ্বসের শংকা,শুষ্ক মৌসুমে প্রখর রুদ্রতাপ ঘেঁষা বস্তিতে প্রচন্ড কষ্টে বসবাস করতে হচ্ছে।চেয়ে-চেয়ে আসছি কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন হয়ে দেশে ফিরতে পারবো।নিজদেশে ফেরার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন রোহিঙ্গারা।

তারা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, নাগরিকত্ব ও রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি, নিজস্ব ঘরবাড়ী সম্পত্তি ফেরত, নিরাপত্তা এবং নির্যাতনের বিচারের দাবি পূরণের কথাও তুলে ধরেন।

ক্যাম্পে অবস্থিত মিয়ানমারের বুচিডং এলাকার রোহিঙ্গা নেতা মোঃ নবী (৬০) জানান, প্রায় সোয়া লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিলেন। ফেরার প্রশ্নে তাদের ৫-দফা পূরণের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর ভয় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে আবার ক্যাম্পে ঢোকানো হবে কিনা।”আমাদের যে পাড়া ছিল সেটা সমান করে মগ, চাকমাদের দিয়ে এই মাথায় একটা আর ওই মাথায় একটা ঘাঁটি বসাইছে। তাহলে আমাদের নিয়ে কোথায় রাখবে?”
“আমরা নিজেরাই চলে যেতে চাই। থাকতে চাই না।

এদিকে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় সাড়ে লাখ জনগোষ্ঠীর মাঝে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার আশ্রয়ন।রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা নানা শংকায় রয়েছেন।পরিবহন সমস্যা,দ্রব্যমুল্যের উর্ধগতি,খাদ্যসামগ্রীর বাড়তি দাম।পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া এবং সময় গুণতে হচ্ছে।পাশাপাশি রোহিঙ্গারা অশিক্ষিত জাতিগোষ্ঠী হওয়ায় দিন-দিন সহিংসু হয়ে উঠছে।তাঁরা ইয়াবা,মাদক, মানব পাচার,চুরি-ডাকাতি, সহিংসতা সহ নানা নাশকতায় জড়িয়ে পড়ছে।তা নিয়ে স্থানীয়রা রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত প্রত্যাবাসন চান।

উখিয়ার বালুখালী বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের ভাষায় রোহিঙ্গারা এখন পুরো এলাকার জন্য নানা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।ব্যবসা এখন রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে। ক্যাম্প কেন্দ্রিক শত-শত দোকান পাট বসিয়ে সরকারের যেমনি রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে,তেমনি স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দেউলিয়ার পথে বসেছে।তিনি বলেন, “আমরা স্থানীয় জনগণ হিমশিম খাচ্ছি”।৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প লাগোয়া বাংলাদেশি এক পরিবারের ছাত্তার মিয়ার আতঙ্ক আরো বেশি। তাদের চাষের জমিজমা ক্ষেত খামারে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়ে উল্টো তাদেরই এলাকা ছাড়ার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ করে পরিবারটি।ইতিপূর্বে একাধিকবার তাঁর চাষের জমির ফসল নষ্ট করে দিয়েছে।

গৃহকত্রী আয়েশা বেগম বলেন, বাধ্য হয়ে আর্মি ডেকে রোহিঙ্গাদের শাসাতে হয়েছে। তার সন্দেহ এই রোহিঙ্গারা আর ফেরত যাবে না।

“এরা আসলে যাবে না। এমন সহযোগিতা পেলে কেউ যায়! আমাদের তাঁরা বলে এ জমি শেখ হাসিনা এনজিওর কাছে বেঁচে দিছে। এটা আমাদের জায়গা। তোমরা চলে যাও।”উখিয়ার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পালংখালী ইউপির চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান,যতদ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চাই।মানবতার দোহাইয়ে রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের উপর অমানবিক প্রভাব ফেলেছে।

রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন কমিটির সভাপতি এবং উখিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন,এমনিতে নানা কারণে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরার বিষয়টি ঝুলে আছে। রোহিঙ্গার হাতে দিন দিন স্থানীয় বাসিন্দারা হেনস্তার শিকার হচ্ছে।উখিয়া-টেকনাফের বনভুমি,পাহাড়,পরিবেশ,জীববৈচিত্র্য সব বিলুপ্তপ্রায়। তাদের প্রত্যাবাসন না হলে তৃতীয় বাইরের দেশে নিয়ে যাওয়ার দাবী করেপ্রত্যাবাসন নিশ্চিতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো দরকার। এভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা না গেলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কোন দিনও হবে না।এই জনসংখ্যা পুরো কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের চেয়েও অনেক বেশি।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করেছে বলেও দাবী করেন তিনি।

উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে ১১লাখ ১৮হাজার ৫৭৬। যার মধ্যে শুধু ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্টের পরই এসেছে ৭লাখ ৪১হাজার ৮শ ৪১ জন।এই জনসংখ্যা পুরো কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের চেয়েও অনেক বেশি।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করেছে৷ সেখানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা ১৩ লাখ৷ এদের মধ্যে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা উভয় জনগোষ্ঠীর সদস্যরাই আছেন৷ তবে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে এ সংকটের তীব্রতা বেশি৷কক্সবাজারে অনেকেই আবাদী জমি ও মৎস্যক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন৷ তাদের অনেকেই দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন৷ সস্তায় শরণার্থী পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের কাজের সুযোগ কমেছে, মজুরিও কমে গেছে৷

আপনার ইমেইল প্রদর্শন করা হবে না।