মুহাররম মাস এবং আশুরার ফজিলত, তাৎপর্য ও আবেদন ………মাওলানা আমিনুর রশিদ পটিয়াবী

0 ১০৭

 

মুহাররম পরিচিতি:
মুহাররম এটি আরবী শব্দ এর অর্থ হল, সম্মানিত, বরকতময়, নিষিদ্ধ। আরবী ১২ মাসের ১ম মাসের নাম “মুহাররম” । যেহেতু পবিত্র কুরআনে বর্ণিত মুহাররম মাস সহ চারটি মাস অতি সম্মানি ও বরকতময়, কেননা এতে ইবাদতের সাওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। মুহাররম মাস মহান আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে নির্দিষ্টকৃত একটি সম্মানিত মাস।
মুহাররম মাস বরকতময় ও সম্মানিত :
মুহাররম মাসটি অত্যন্ত সম্মানিত, পবিত্র, ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। সে কারণে ইসলামের প্রাথমিক যুগে থেকে ৭ম হিজরী পর্যন্ত এই মাসে যুদ্ধ, মারামারি পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। মহান আল্লাহ তায়া’লা বলেন:
اِنَّ عِدَّةَ الشُّهُوْرِ عِنْدَ اللهِ اِثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِى كِتَابِ اللهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوَاتِ وَالْاَرِضَ مِنْهَا اَرْبَعةٌ حُرُمٌ. ذٰلِكَ الدِّيْنُ القَيِّمُ.فَلَا تَظْلِمُوْا فِيهِنَّ اَنْفُسَكُمْ
নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনার মাস বারটি, আসমান সমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তম্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্টিত বিধান, সুতারাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। । অর্থাৎ, এ পবিত্র মাসগুলোর যথাযথ আদব রক্ষা করে এবং এবাদত বন্দেগিতে অলস থেকে নিজেদের ক্ষতি করো না। সে সম্মানিত চারটি মাস কি কি? কোরআনে এর বিশ্লেষন নেই । হাদিস শরীফে এ বিশ্লেষেন এসেছে । সহিহ বোখারীর বর্ণনায় এসেছে “ সে সম্মানিত চার মাসের তিন মাস হল লাগাতার, জিলক্বা’দা, জিলহাজ্ব ও মুহাররম আরেকটি হল রজব । [1]
“নিজেদের উপর জুলুম করোনা” এর অর্থ:
তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না এর অর্থ হ’ল, এ পবিত্র মাসগুলোর যথাযথ আদব রক্ষা করে এবং এবাদত বন্দেগিতে অলস থেকে নিজেদের ক্ষতি করো না।
ইমাম জাসসাস রহ. আহকামুল কোরআন গ্রন্থে বলেন, কোরআনের এ বাক্য ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এ মাসগুলোর এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার ফলে এতে এবাদত করা হলে বাকী মাসগুলোও এবাদতের তাওফিক ও সাহস লাভ করা যায়। অনুরূপ কেউ এ মাসগুলোতে পাপাচার থেকে দুরে রাখতে পারলে দুরে থাকা সহজ হয়। তাই এ সুযোগের সদ্ব্যবহার থেকে বিরত থাকা হবে অপূরণীয় ক্ষতি। [2]
আশুরা কি? আশুরা মানেই কি কারবালা দিবস ?
মুহাররম মাসের ১০তারিখ “আশুরা” নামে খ্যাত। “আশুরা” আরবী শব্দ। এর অর্থ দশম দিন । এদিনটি ঐতিহাসিকভাবে প্রণিধানযোগ্য। এদিন প্রাচীন আরবরা ক্বাবার দরওয়াজা দর্শনার্থীদের জন্য উম্মুক্ত রাখত। এদিনটি মানবতা কে স্বরণ করিয়ে দেয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা। এসব ঘটনায় রয়েছে ইতিহাসের জোয়ার -ভাটা ও উত্তান-পতনের গুরুত্তপূর্ণ ভুমিকা। আমাদের সমাজে অনেকের ধারণা, “আশুরা” মানেই কারবালা। আশুরাকে তারা “কারবালা দিবস” হিসাবেই পালন করে। “আশুরা” দিবসে সংঘটিত বহু ঘটনার একটি হল ”কারবালা ট্রাজেডি” এতে কোন সন্দেহে নেই। কিন্তু কারবালার দুঃখবহ ঘটনায় একমাত্র “আশুরা” নয়। কারণ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় মহানবী স. এর যুগেও “আশুরা” পালিত হত। তখনও কিন্তু কারবালা ঘটনা সংঘটিত হয়নি। কাজেই কারবালা ঘটনার কারণে আশুরার মর্যাদা ও তাৎপর্য সৃষ্টি হয়নি। এ দিনটির তাৎপর্য পৃথিবীর সুচনা হতেই চলে আসছে। বরং আমরা বলতে পারি “আশুরার” দিনে সংঘটিত হওয়ায় এ ঘটনা অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ন হয়েছে। [3]
আশুরা নাম করণের কারণ কি?
আল্লামা আইনী রহ. বলেন, আশুরা অর্থ দশম, মুহাররম মাসের দশম তারিখ হওয়াই সে দিনকে আশুরা বলা হয়। এইটিই মুহাদি্দসীন কেরামগণের কাছে প্রসিদ্ধ।
কতিপয় মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেন, মুহাররমের ১০ তারিখে আল্লাহ তায়ালা ১০জন নবী আ.কে ১০টি মু’জিযা মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন বিধায় সে দিনকে “আশুরা” বলা হয়। [4]
মুহাররম মাসে রোজার ফজিলত:
মুহাররম মাসের রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তাই রাসুল স. মুহাররম মাসে রোযা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই ব্যাপারে হাদিসের কিতাবে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত রাসুল স. ইরশাদ করেন,
عن ابى هريرة رض افضل الصيام بعد رمضام شهر الله المحرم. افضل الصلاة بعد الفريضة صلاة الليل
অর্থ: রমজোনের রোজার পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজাই শ্রেষ্ঠ এবং ফরজ নামের পর রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজেই সর্ব শ্রেষ্ঠ নামাজ। [5]
আশুরার রোজার ফজিলত:
মুহাররম মাসের আশুরার রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ । তাই রাসুল স. মুহাররম মাসে রোযা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই ব্যাপারে হাদিসের কিতাবে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
ما رأيت النبي صلى الله عليه وسلم يتحرى صيام يوم فضله على غيره إلا هذا اليوم يوم عاشوراء وهذا الشهر يعني رمضان
অর্থ ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি।’ [6]
অন্য একটি হাদিসে হযরত আলী রা.বর্ণিত ,
عن على رضى الله عنه قال سأله رجل فقال اى شهر تأمرنى ا ن اصوم بعد شهر رمضان فقال له ما سمعت احداً يسأل عن هٰذا الا رجلا سمعته يسٰل رسول الله صلى الله علىه وسلم وانا قاعد عنده فقال يا رسول الله اىُّ شهر تأمرنى ان اصوم بعد شهر رمضان قال ان كنت صائما بعد شهر رمضان فصم المحرم فانه شهر لله. فيه يوم تاب الله فيه على قوم ويتوب فيه على قوم اٰخرين
হযরত আলী রা.কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মুহররম মাসে রাখ। কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন [7]
অন্য হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন..
‘صيام يوم عاشوراء أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله
অর্থ: আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন । [8]
আশুরার রোজা যেন ইহুদীদের রোজার মত না হয়:
আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, আমরা অবশ্যই ইসলামের বিধিবিধান পালন করবো রাসুল স. এর আদর্শ অনুযায়ী।, রাসুল স. যে আমলটি যেভাবে আদেশ করেছেন সেভাবে পালন করবো এবং রাসুল স. যে বিষয়টি নিষেধ করেছেন তা বর্জন করবো। আমাদের কোন ইবাদতই যেন অন্য ধর্মের সাদৃশ্য না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখব। আমরা আশুরার রোযা রাখব, তবে শুধুমাত্র ১০ তারিখ রোজা রাখবনা । কারণ ইহুদীগণ শুধুমাত্র ১০ তারিখেই রোজ রাখেন। তাদের যেন সাদৃশ্য না হয়, সেজন্য রাসুল স. ১০ তারিখের আগে ৯ তারিখ বা পরে ১১ তারিখ একটি রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি আশুরার রোযা সম্পর্কে একটি হাদিসে ইরশাদ করেছেন যে,
صوموا عاشوراء وخالفوا فيه اليهود، صوموا قبله يوما أو بعده يوما
অর্থ:-‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে; আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।’ । [9]
অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:-,
عن ابن عباس رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لئن بقيت الى قابل لاصومن التاسع
অর্থ: ‘হযরত ইবনে আব্বস রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে (১০ তাখের সাথ) ৯ তারিখেও অবশ্যই রোযা রাখব [10]
আশুরার রোযা কি শুধু নয় দশ নাকি দশ এগারোও প্রমাণিত?
আশুরার রোযা, ৯ ও ১০ ই মুহররম যেমন রাখা যায়, তেমনি ১০ ও ১১ তারিখও রাখা যায়। উভয় অবস্থারই দলীল বিদ্যমান রয়েছে। । হাদীসে বর্ণিত হয়েছে>….
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” صُومُوا يَوْمَ عَاشُورَاءَ، وَخَالِفُوا فِيهِ الْيَهُودَ، صُومُوا قَبْلَهُ يَوْمًا، أَوْ بَعْدَهُ يَوْمًا

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা আশুরার রোযা রাখ ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে; আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ । [11]
মহররম ও আশুরা কেন্দ্রিক নানা কুসংস্কার :
এ মাসে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এদিনে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরত প্রকাশ করেছেন। বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে ডুবিয়ে মেরেছেন। । [12]
তবে এ দিনের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নানা ভিত্তিহীন কথাও বলে থাকেন। যেমন, এদিন হযরত ইউসুফ আ. জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইয়াকুব আ. চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন। হযরত ইউনুস আ. মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইদরীস আ.কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। অনেকে বলে, এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই।[13]
এ মাসের একটি ঘটনা শাহাদাতে হুসাইন রা. । বলাবাহুল্য যে, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই তো শিক্ষা-‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয়ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয়।’
অন্য হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই যারা মুখ চাপরায়, কাপড় ছিড়ে এবং জাহেলী যুগের কথাবার্তা বলে। ’(সহিহ বোখারী ,মুসলিম)
অতএব শাহাদাতে হুসাইন রা.কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হওয়া এবং সব ধরনের জাহেলী রসম-রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য।
আমাদের আবেদন:
এ মাসে যেসব অনৈসলামিক কাজকর্ম ঘটতে দেখা যায় তার মধ্যে তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল ও র‌্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। এজন্য অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদী থেকেও বিরত থাকে। বলাবাহুল্য এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার।
মোটকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলো যখা, তওবা- ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল। এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন- সুন্নাহ মোতাবেক চলা মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। তাই বর্জনীয় বিষয় গুলো থেকে বিরত থাকা ও করণীয় বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান ও মনযোগী হয়ে আমল করার জন্য সকলে প্রতি আবেদন করছি।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।
………………………………………………………………………………………..
লিখক পরিচিতি:
মাওলানা আমিনুর রশিদ পটিয়াবী
খতিব, গাঁথাছড়া বায়তুশ শরফ জামে মসজিদ.
সভাপতি, লংগদৃ উপজেলা ইমাম সমিতি
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা।
01820319811. 01552712027

আপনার ইমেইল প্রদর্শন করা হবে না।