বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার বাড়ছে

0 ৫১

আলোকিত লংগদু ডেক্সঃ

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার বাড়ছে৷ আর এই আইনটি বাংলাদেশের করোনার মধ্যে এই সময়ে সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়দের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে৷‘বিতর্কিত’ সর্বশেষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১১ জনের বিরুদ্ধে রমনা থানায় দায়ের করা মামলায় চারজনকে এপর্যন্ত চার জনকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷ যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হলেন: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য মো. দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া, ব্যবসায়ী মোস্তাক আহম্মেদ, কার্টুনিস্ট আহম্মেদ কবির কিশোর এবং ডিএসই’র পরিচালক ব্যবসায়ী মিনহাজ মান্নান৷ মিনহাজ মান্নান কয়েক বছর আগে জঙ্গিদের হাতে নিহত জুলহাজ মান্নানের ভাই৷

আসামিদের মধ্যে রয়েছেন: প্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল ও সাহেদ আলম, সায়ের জুলকারনাইন, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ ও প্রবাসী ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন৷
তাদের বিরুদ্ধে মোটা দাগে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা হলো: তারা ‘আই অ্যাম বাংলাদেশি’ নামে একটি ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও করোনা ভাইরাস নিয় গুজব ছড়িয়েছেন৷ তারা সরকারবিরোধী পোস্ট ও সরকার দলীয় বিভিন্ন নেতার কার্টুন দিয়েও গুজব ছড়িয়েছেন৷ আর এটার মাধ্যমে তারা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন৷ এই অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনের ২১/২৫১)(খ)/৩১/৩৫ ধরায় মামলা হয়েছে৷
কিন্তু এইসব অভিযোগের বিস্তারিত কিছু নেই মামলার এজাহারে৷ আর কিভাবে তারা এই ‘অপরাধ’ করলেন ও তার ফলাফল কি তাও সুনির্দিষ্ট নয়৷

আটক কার্টুনিস্ট আহম্মেদ কবির কিশোরের ভাই সাংবাদিক আহসান কবির বলেন, ‘‘আমার ভাই রাষ্ট্র বা সরকারবিরোধী কোনো কাজ করেননি৷ তিনি যে কার্টুন আঁকেন তাতে সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে৷ তিনি স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে যেমন কার্টুন এঁকেছেন, তেমনি এখন দেশের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে কার্টুন আঁকছেন৷ তিনি কাউকে অপমান করেননি৷ গুজব ছড়াননি৷”

রাজনৈতিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সন্ত্রসী কর্মকাণ্ড বিষয়ে সোচ্চার মেক্সিকোর সাংবাদিক মিরোস্লাভা ব্রিচ ভেলডুসিয়া গত মার্চ মাসে খুন হয়৷ জানা যায়, এ ধরণের সামাজিক অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি দেয়া হচ্ছিল তাঁকে৷

তিনি বলেন, ‘‘দেশের ১৭ কোটি মানুষ দুর্নীতি করে না৷ দুর্নীতি করে ক্ষুদ্র একটি অংশ৷ ওই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কথা বললে দেশের বা দেশের মানুষের অসম্মান হয় কিভাবে!”

তার মতে এখন এই আইনটি, ‘‘জনগণকে কোনো নিরাপত্তা দিচ্ছেনা৷ দুর্নীতিবাজরা তাদের রক্ষায় আইনটি ব্যবহার করছে৷”

আর দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়ার ভগ্নিপতি জাকির চৌধুরী বলেন, ‘‘আমার মনে হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে দেশের মানুষকে নিরাপত্তাহীন করা হচ্ছে৷ দিদার একজন আইটি স্পেশালিষ্ট৷ দেশের বাইরে পড়াশুনা করে দেশে ফিরে মানুষের জন্য কাজ করছেন৷ করোনায় তাদের সংগঠন রাষ্ট্রচিন্তার মাধ্যমে অভাবী মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন৷”

তিনি বলেন, ‘‘দিদারের কাজ রাষ্ট্রবিরোধী নয়৷ সে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়৷ সে রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করছে৷ আমরা তার মুক্তি চাই৷”

বাক স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আর্টিকেল নাইনটিন-এর তথ্য, ২০১৮ সালে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকসহ মুক্তচিন্তার চর্চাকারীদের বিরুদ্ধে ৭১টি মামলা হয়েছে৷ ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয় ৬৩টি৷ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৪৫টি মামলা হয়েছে৷ যার অধিকাংশই সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে৷

আর লকডাউনে এপ্রিল মাসে সারাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১০টিরও বেশি মামলা হয়েছে জিজিটাল নিরাপত্তা আইনে৷ মত প্রকাশের জন্য স্বাধীনতার জন্য কাজ করা ‘মুক্ত প্রকাশ’ নামে একটি সংগঠন এই তথ্য দিচ্ছে৷ সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সালিম সামাদ বলেন, ‘‘লকডাউনের প্রথম মাসে ২০ জন সাংবাদিক মামলা, গ্রেপ্তার ও হামলার শিকার হয়েছে৷ এরা ত্রাণ চুরি, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিগৃহীত হয়েছেন৷ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না৷”

তিনি বলেন, ‘‘অন্য আইনে সাংবাদিকদের হয়রানি তেমন সহজ নয় বলে এখন জিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করা হচ্ছে৷ কারণ এই মামলায় জামিন পাওয়া যায়না৷ আর করোনার সময় এই আইনে মামলা বেড়ে যাচ্ছে৷”

সর্বশেষ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাকে তিনি সরকারের নিজের ওপর আস্থাহীনতার প্রকাশ বলে মনে করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘এখন আর দুর্নীতি, অব্যবস্থা, অনিয়মের কথা কেউ বললে সহ্য করতে তারা পারেনা৷ তাকে মামলা দিয়ে হয়রানি করে৷ মাস্ক চুরির কথা বললে গ্রেপ্তার করা হয়, চাকরি চলে যায়৷”

প্রশ্ন উঠেছে, এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কাদের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? এতে কারা লাভবান হবে? আর এই সময়ে এই আইনের ব্যবহার কেন বাড়ছে? জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইনের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা উদ্বেগের সাথ এই সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি লক্ষ্য করছি৷ আর তা বেশি ব্যবহার হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এটা আসলে আমাদের আতঙ্কিত করে৷”

তিনি বলেন, ‘‘এই সময়ে ত্রাণ নিয়ে কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে৷ করোনা প্রতিরোধে কোথায় বাধা আছে এগুলো সরকারের জানা দরকার৷ সাংবাদিকেরাই তা জানাচ্ছেন৷ কিন্তু তা করতে গিয়ে তারা যদি মামলা গ্রেপ্তারের শিকার হন তাহলে তো দুর্নীতিবাজেরা সুবিধা পাবে৷ এটা তো হতে পারে না৷”

করোনা প্রতিরোধে সমন্বয়হীনতার কথাতো আমরা মন্ত্রীদের মুখেও শুনছি৷ তাহলে সাংবাদিক বা সচেতন নাগরিকরা তা বলতে পারবেন না কেন? ডিজিটাল আইন দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়৷

আপনার ইমেইল প্রদর্শন করা হবে না।