মা ফিরেছে-শিশুদের মুখে হাসি ফুটেছে: মানবিকতার জয়ে জীবনরক্ষা হলো রাবেয়ার
মো.গোলামুর রহমান।
চরম অনিশ্চয়তা ও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে অবশেষে সুস্থ অবস্থায় দুই সন্তানকে কাছে পেয়ে আনন্দ অশ্রুতে আবেগাপ্লুত রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার মাইনীমুখ ইউপির হাজাছড়া গ্রামের হতদরিদ্র মা রাবেয়া আক্তার (২৪)।
হৃদরোগে আক্রান্ত এই মায়ের জীবন বাঁচাতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ভয়েস অব লংগদু’ এর মানবিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে লংগদু উপজেলাবাসী সহ ও প্রবাসীদের সম্মিলিত অর্থায়নে তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি সফল হয়।
দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগের তীব্রতা নিয়ে ভুগছিলেন রাবেয়া আক্তার নামের এই মা। মাত্র চার মাস ও চার বছর বয়সী ছোট্ট দুটি শিশু সন্তান নিয়েই তাঁর সংসার। হৃদরোগের কারণে সৃষ্ট শ্বাসকষ্টের কারনে তিনি তাঁর নবজাতক শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে পারছিলেন না। চরম দরিদ্রতার কারণে যখন সকল চিকিৎসার পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন জীবন বাঁচানোর শেষ আকুতি নিয়ে তিনি ‘ভয়েস অব লংগদু’ সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী অনলাইন কমিউনিটির শরণাপন্ন হন।
আবেদনে সাড়া দিয়ে মানবিক গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় ভয়েস অব লংগদু। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাবেয়ার তৎকালীন শারীরিক অবস্থা, মাতৃদুগ্ধ পান করতে না পেরে রাবেয়ার চার মাস বয়সী শিশুটির ক্ষুধার্থ থাকার নিদারুণ বাস্তবতা এবং অবুঝ দুটি শিশু সন্তানের মায়ের আদর স্নেহ বঞ্চিত হওয়ার মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরে সংগঠনটির পক্ষ হতে চিকিৎসার জন্য অর্থ সহায়তায় চেয়ে মানবিক আবেদন জানানো হয়।
‘ভয়েস অব লংগদু’-এর এই মানবিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে লংগদু উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ এগিয়ে আসেন। মানবিক সহায়তায় বিশেষভাবে যুক্ত হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লংগদু সেনা জোন ও উপজেলা অফিসার্স ক্লাবের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ। এছাড়াও দেশ ও প্রবাস থেকে আসা অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তায় অতি দ্রুতই রাবেয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগৃহীত হয়।
সংগৃহীত অর্থে রাবেয়ার পরিবারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঢাকার ইবনে সিনা কার্ডিয়াক সেন্টারে তাঁর সফল ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর হৃদযন্ত্র থেকে নষ্ট হওয়া ভাল্ভ অপসারণ করে নতুন ভাল্ভ প্রতিস্থাপন করা হয়। এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেন ৪ মাস ও চার বছর বয়সী ছোট্ট দুটি শিশু সন্তানের জননী রাবেয়া আক্তার।
চিকিৎসা পরবর্তীতে গত ২৭ নভেম্বর ২০২৫, এক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে রাবেয়া আক্তারের জন্য গঠিত ফান্ডের চূড়ান্ত হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে ফান্ডে থাকা অবশিষ্ট ১১,৩০০ (এগার হাজার তিন শত) টাকা তাঁর স্বামী দিনমজুর সুজন মিয়ার হাতে তুলে দিয়েছেন সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক (প্রভাষক, লংগদু সরকারি ডিগ্রি কলেজ) এসময় সংগঠনটির সম্মানিত সদস্য প্রভাষক নুর মোহাম্মদ ও ব্যাবসায়ী মনতাজ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। রাবেয়ার চিকিৎসা সহায়তার জন্য ভয়েস অব লংগদু সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী অনলাইন কমিউনিটি কর্তৃক সংগৃহীত সর্বমোট ৩,৬৩,০২১ (তিন লক্ষ তেষট্টি হাজার একুশ) টাকার সম্পূর্ণ হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে চিকিৎসা সহায়তা ফান্ডটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
চিকিৎসা সহায়তা ফান্ডের সকল হিসাব বুঝে পেয়ে রাবেয়ার স্বামী দিনমজুর সুজন মিয়া আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, এবং ভয়েস অব লংগদু এর আহবানে মানবিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসা মানুষদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন— “জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে মানুষ কতটা একা হয়ে পড়ে, তা আমি খুব পরিষ্কারভাবে অনুভব করেছি। মনে হচ্ছিল আমার সামনে আর কোনো পথ নেই, আমার বাচ্চারা হয়তো তাদের মাকে হারাবে। কিন্তু সেই অসহায় সময়েই ভয়েস অব লংগদু আমার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। আপনাদের কারণে আমার স্ত্রী আজ সুস্থ হয়ে সন্তানদের নিকট ফিরতে পেরেছে। আমি ভয়েস অব লংগদু ও এর প্রতিটি সদস্যের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই। আল্লাহ আপনাদের এই মানবিক প্রচেষ্টাকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিন এবং আল্লাহ যেন কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে এই সংগঠন কে কাজ করা সুযোগ করে দেন।”
সংগঠনটির মানবিক আহবানে বিশেষ ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লংগদু সেনা জোন অধিনায়ক মহোদয়কে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। রাবেয়ার অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশুটি যেন ক্ষুধার্ত না থাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে অসুস্থ না হয়, সেই লক্ষ্যে লংগদু সেনা জোন কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে এক বছরের জন্য প্রতি মাসে প্রয়োজনুযায়ী বিনামূল্যে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প খাবার (ফর্মুলা মিল্ক) প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে।
ভয়েস অব লংগদু কর্তৃপক্ষ রাবেয়ার চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে আসা সকল মানবিক মানুষ, ব্যাক্তি প্রতিষ্ঠান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এবং অত্যন্ত মহৎ ও মানবিক এই উদ্যোগে আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার সাথে কাজ করার জন্য সংগঠনটির সম্মানিত সকল সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
মন্তব্য বন্ধ আছে